ব্যাকরণ
‘ব্যাকরণ’ (বি+আ+√কৃ+অন) শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে। এর বুৎপত্তিগত অর্থ হল বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। ব্যাকরণকে বলা হয় ভাষার সংবিধান। এটি ভাষার প্রকৃতি ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করে এবং অভ্যন্তরীণ নিয়মকানুন ও রীতিনীতি শৃঙ্খলাবদ্ধ করে থাকে। ব্যাকরণ মূলত ভাষা ব্যবহারের অন্তর্নিহিত তথ্য। এর কাজ হল ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা আবিষ্কার করা। সহজ ভাষায় বলা যায়, ব্যাকরণ ভাষাকে বর্ণনা করে।
ভাষা ব্যাকরণকে অনুসরণ করে না বরং ব্যাকরণই ভাষার অনুগামী
ভাষা নদীর মত বহমান। মানুষের মুখে মুখে ভাষার ব্যবহারে যে পরিবর্তন ঘটে তাতে নতুন নিয়মের সৃষ্টি হয়। সে নিয়মগুলোই কালক্রমে ব্যাকরণের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ব্যাকরণের ইতিহাস
ব্যাকরণ চর্চার আদিভূমি হল গ্রিস। প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডায়লগ’-এ ব্যাকরণের কিছু নিয়ম-কানুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরিস্টটল তার ‘পোয়েটিকস’ গ্রন্থে ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে প্রাচীনতম পরিচিত ব্যাকরণের হ্যান্ডবুকটি হল ‘আর্ট অফ গ্রামার’। এটি গ্রীক পণ্ডিত ডায়নিসিয়াস থ্রাক্স কর্তৃক রচিত। স্পষ্টভাবে এবং কার্যকরভাবে কথা বলা এবং লেখার জন্য এটি ছিল একটি সংযোগ গাইড।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বঙ্গদেশে প্রধানত সংস্কৃত ব্যাকরণের চর্চা হয়েছে। বাংলা ভাষার উৎপত্তি যে প্রাকৃত ভাষা থেকে, তার চর্চা হয়েছে খুব সামান্যই। পণিনি ছিলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বৈয়াকরণিক। তার বিখ্যাত ‘অষ্টাধ্যায়ী’ গ্রন্থটি সংস্কৃত ভাষার ওপর রচিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাঙালির ব্যাকরণ চর্চা বলতে মোটামুটি কিছু টীকাভাষ্যকে বোঝায়।
বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাস
ইউরোপীয়রা প্রথম বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা শুরু করে। তারা নানা প্রয়োজনে ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাষাসমূহ শিখতে বাধ্য হয়েছিল। নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদ থেকেই পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানোএল দা আস্সুম্পসাঁউ (Manoel da Assumpcam) পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। তিনি ১৭৩৪-৪২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে একটি গীর্জায় ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালনকালে “Vocabolario em idioma Bengalla, e Potuguez dividido em duas partes” শীর্ষক গ্রন্থটি রচনা করেন। গ্রন্থটির প্রথম অংশ ব্যাকরণের একটি সংক্ষিপ্তসার এবং দ্বিতীয় অংশ একটি অভিধান যাতে পর্তুগিজ থেকে বাংলা এবং বাংলা থেকে পর্তুগিজ শব্দ অনুবাদ করা হয়েছে। ১৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে গ্রন্থটি পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। এতে শুধু রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। ধ্বনিতত্ত্ব সম্পর্কে এ গ্রন্থে কোনো আলোচনা নেই।
বাংলা ভাষার দ্বিতীয় ব্যাকরণ রচয়িতা ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড। তার A Grammar of the Bengali Language প্রকাশিত হয় ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। এটি বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম ব্যাকরণ গ্রন্থ। হ্যালহেড রচিত ব্যাকরণে সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাব লক্ষণীয়। তিনি অনেকাংশেই বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের ছাঁচে ফেলে বিশ্লেষণ করেছেন। চার্লস উইলকিনসন এবং পঞ্চানন কর্মকার যৌথ প্রচেষ্টায় ছাপাখানার (হুগলি) জন্য যে বাংলা হরফ (font) প্রবর্তন করেছিলেন, তার সাহায্যেই হ্যালহেডের গ্রন্থে বাংলা উদাহরণগুলি মুদ্রিত হয়েছে।
বাংলা ভাষার নিজস্ব উপাদান ও স্বাতন্ত্র্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন রাজা রামমোহন রায়। ১৮২৬ সালে তার রচিত ‘Bengali Grammar in English Language’ গ্রন্থটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৩৩ সালে তিনি এটিকে ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ নামে অনুবাদ করেন। এটিই বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম ব্যাকরণ গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত।
ব্যাকরণ বিষয়ক গ্রন্থ
| গ্রন্থের নাম | রচনার ভাষা | রচনাকারি |
|---|---|---|
| Vocabulario Em Idioma Benglla, EPoruguez. Dividido Em Duas Partes | পর্তুগিজ | মনোএল দা আসসুম্পসাঁও |
| A Grammar of the Bengal Language | ইংরেজী | নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড |
| A Grammar of the Bengali Language | ইংরেজী | উইলিয়াম কেরি |
| Bengali Grammar in English Language / গৌড়ীয় ব্যাকরণ | ইংরেজী / বাংলা | রাজা রামমোহন রায় |
| ব্যাকরণ কৌমুদী (১৮৫৩) | বাংলা | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর |
| ব্যাকরণ মঞ্জুরী | বাংলা | ড. মুহাম্মাদ এনামুল হক |
| আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ | বাংলা | জগদীসচন্দ্র ঘোষ |
| The origin and development of the Bengali Language | ইংরেজী | ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় |
| ভাষা প্রকাশ বাংলা ব্যাকরণ | বাংলা | ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় |
| প্রমীত ভাষার বাংলা ব্যাকরণ | বাংলা | রফিকুল ইসলাম ও পবিত্র সরকার |
| বাংলা ব্যাকরণ (১৯৫৮) | বাংলা | ড. মুহম্মাদ শহীদুল্লাহ |
এছাড়া বাংলা ভাষার কিছু অভিধান –
- বাংলা ভাষার অভিধান – উইলিয়াম কেরী
- শব্দমুঞ্জুরী – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
- যথাশব্দ – মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
- বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধান – ড. মুহম্মাদ শহীদুল্লাহ
- বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান – আহমদ শরীফ
- প্রমিত বাংলা বানান অভিধান – জামিল চৌধুরী
- সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান – আবু ইসহাক

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন