মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে থাকে। বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ৩৫০০ ভাষা প্রচলিত রয়েছে।
মুখে উচ্চারিত অর্থবোধক ও মনোভাব প্রকাশক ধ্বনিসমষ্টিকে ভাষা বলে।
প্রত্যেক ভাষার ৪টি (মতান্তরে ৩টি) মৌলিক অংশ থাকে। যথা: ধ্বনি, শব্দ, অর্থ ও বাক্য।
ভাষার মূল উপাদান ধ্বনি। বাকযন্ত্রের সাহায্য ধ্বনির সৃষ্টি হয়। কিন্তু ভাষার মৌলিক উপাদান হচ্ছে শব্দ। কারণ ভাষার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থবাচকতা প্রকাশ করা। ধ্বনিগুলো অর্থ প্রকাশ নাও করতে পারে (যেমন- শিশুর মুখের ধ্বনি); কিন্তু শব্দের সাথে অর্থের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। আবার একাধিক শব্দের উপযুক্ত সমন্নয়ে বাক্য গঠিত হয়। একটি সম্পূর্ণ বাক্যই ভাষার প্রাণ। বাক্যকে ভাষার মূল উপকরণ বলা হয়।
| ভাষার মূল উপাদান / ভাষার বাহন বা স্বর বা ক্ষুদ্রতম একক | ধ্বনি |
| শব্দের মূল উপাদান / মূল উপকরণ / ক্ষুদ্রতম একক | ধ্বনি |
| ভাষার মূল উপকরণ / ভাষার ছাদ / ভাষার বৃহত্তম একক | বাক্য |
| বাক্যের মূল উপাদান / উপকরণ বা মৌলিক উপাদান / উপকরণ বা মূল একক / ক্ষুদ্রতম একক | শব্দ |
| শব্দের গঠনগত একক / ভাষার ইট | বর্ণ |
| বাক প্রতঙ্গজাত ধ্বনির ক্ষুদ্রতম একক বা মৌলিক অংশ | ধ্বনিমূল |
ভাষা পরিবার
ভাষা পরিবার বলতে বংশগতভাবে সম্পর্কিত একাধিক ভাষাকে বোঝায়। একই পরিবারভুক্ত ভাষাগুলো একটি সাধারণ আদিভাষা থেকে উদ্ভুত হয়েছে বলে মনে করা হয়। পৃথিবীতে ১০০টিরও বেশি ভাষা পরিবার আছে। উপমহাদেশের ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দুটি ভাষা পরিবার হল: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার ও দ্রাবিড় ভাষা পরিবার।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্গত ভাষাগুলো হল: ইংরেজী, উর্দু, সিন্ধি, হিন্দি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, মারাঠি, বাংলা, ওড়িয়া, অসমিয়া, ভোজপুরি ইত্যাদি।
দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্গত ভাষাগুলো হল: তামিল, তেলেগু, কন্নড় ও মালয়ালয়।
বাংলা ভাষা
বাংলা ভাষা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বাঙালি জাতির প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা। মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মাতৃভাষা।
বাংলা ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা। এছাড়াও এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রধান কথ্য ভাষাও বাংলা। এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, উড়িষ্যা রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলাভাষী মানুষ রয়েছে। ভারতে হিন্দির পরেই সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা বাংলা। সারা বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ও স্তোত্র বাংলায় রচিত।
বাংলা ভাষার আদি উৎস ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। মধ্য এশিয়ার পশ্চিম এবং ইউরোপের মধ্যভাগ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ভূখণ্ডের মধ্যে যে জাতি বসবাস করত তাদের ভাষার নাম ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার শাখা ২টি। যথা: কেন্তম ও শতম। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে আলবেনীয় ও বাল্টোস্লাভনীয় ছাড়া বাকিগুলো কেন্তমের শাখাভুক্ত। কেন্তমের এশিয়ার অন্তর্গত দুটি শাখা হল হিরিক ও তুখারিক। শতম শাখাভুক্ত ভাষাভাষীদের একটি গোষ্ঠী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে চলে আসে (তারা আর্য নামে পরিচিত)। এই শতম থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।
বাংলা ভাষার ধারাবাহিক রূপ
শতম > প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা > প্রাচীন ভারতীয় (কথ্য রূপ, সাহিত্য রূপ) > প্রাচীন প্রাচ্য প্রাকৃত > মাগধী / গৌড়ীয় প্রাকৃত > মাগধী গৌড়ীয় অপভ্রংশ > বাংলা
ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লার মতে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে ৭ম শতাব্দীতে, গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে। অপরদিকে ড. সুনীতি কুমার চট্টপাধ্যায়ের মতে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে ১০ম শতাব্দীতে, মাগধী প্রাকৃত থেকে।
বাংলা লিপি
লিপি হল লিখন পদ্ধতি। পৃথিবীর সকল লিপি ফিনিসিয় লিপি থেকে উদ্ভূত হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় লিপি ২টি: ব্রাহ্মী লিপি ও খরোষ্ঠী লিপি। বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছে ব্রাহ্মী লিপি থেকে। অন্যদিকে উর্দু ও ফরাসি লিপির উদ্ভব হয়েছে খরোষ্ঠী লিপি থেকে।
মহাস্থানগড় থেকে মৌর্য সম্রাট অশোকের শাসনামলে লিখিত ব্রাহ্মীলিপি পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় বাংলা লিপির প্রসার ঘটেছিল পাল শাসনামলে। সেন শাসনামলে লিপি গঠন কাজ শুরু হয়। এরপর পাঠান যুগে বাংলা লিপি সাময়িক স্থায়িত্ব লাভ করেছিল।
বাংলা ছাড়াও বাংলা লিপি ব্যবহৃত হয় মণিপুরী, ককবরক ও অসমীয়া ভাষায়। এ লিপির গঠন তুলনামূলকভাবে কম আয়তাকার ও বেশি সর্পিল। বাংলা লিপি সিদ্ধং লিপি থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে মনে করা হয়। বর্তমানে বাংলা লিপি বিশ্বের ৬ষ্ঠ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত লিখন পদ্ধতি।
বাংলা লিপির বিবর্তন
ব্রাহ্মী লিপি > কুষাণ লিপি > গুপ্ত লিপি > সিদ্ধমাতৃকা (সিদ্ধং – জাপানি) লিপি > বাংলা লিপি
বাংলা ভাষারীতি (শ্রেণীবিভাগ)
বাংলা ভাষার মৌলিক রূপ দুইটি। যথা:
- মৌখিক বা কথ্য (চলিত ও আঞ্চলিক বা উপভাষা)
- লৈখিক বা লেখ্য (সাধু ও চলিত)
সাধু রীতি
প্রাচীনকাল থেকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে সাধুভাষা ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপন্ন ভাষাকে সাধু ভাষা হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রথম দিকের বাংলা গদ্যে সাধুরীতির ব্যাপক প্রচলন ছিল। রাজা রামমোহন রায় সাহিত্যে প্রথম সাধু ভাষার প্রয়োগ করেন। সাধু ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য-
- নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে
- পদবিন্যাস সুনিয়ন্ত্রিত
- গুরুগম্ভীর
- তৎসম শব্দবহুল
- সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ এক বিশেষ গঠন পদ্ধতি মেনে চলে
- সর্বনাম, ক্রিয়া ও অনুসর্গের পূর্ণরূপ ব্যবহার করা হয়
- সাধুরীতি নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার অনুপযোগী
চলিত রীতি
সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে চলিত ভাষা বলা হয়। ভাষার এ রীতি নিয়ত পরিবর্তনশীল। অঞ্চলভেদে মানুষের মুখের ভাষায় (চলিত রীতিতে) উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলের জনগণ নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে। এগুলোকে আঞ্চলিক কথ্য ভাষা বা উপভাষা বলে। পৃথিবীর সব ভাষারই উপভাষা রয়েছে। বাংলা ভাষার উপভাষা ৫টি। যথা: রাঢ়ি, ঝাড়খন্ডি, বরেন্দ্রি, বঙ্গালি ও কামরূপি। এক অঞ্চলের মানুষের ভাষার সাথে অন্য অঞ্চলের মানুষের ভাষায় পার্থক্যের জন্য পণ্ডিতগণ একটি আদর্শ ভাষা ব্যবহার করেন। এ ভাষাই আদর্শ চলিত ভাষা বা প্রমিত ভাষা। অর্থ্যাৎ চলিতভাষার আদর্শরূপই হল প্রমিত ভাষা। চলিত ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য-
- পরিবর্তনশীল
- তদ্ভব শব্দবহুল
- নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার উপযোগী
- সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ- এর গঠন সহজরূপ লাভ করে
- সর্বনাম, ক্রিয়া ও অনুসর্গের সংক্ষিপ্তরূপ ব্যবহার করা হয়
বাংলা গদ্যে চলিতরীতির প্রবর্তন করেছিলেন প্রমথ চৌধুরি। তিনি সবুজপত্র (১৯১৪) পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে চলিতরীতি প্রবর্তনের জন্য সংগ্রাম করেন।
উল্লেখ্য বাংলা উপভাষার শ্রেণীবিভাগে অবদান রেখেছেন ব্রিটিশ রাজ্যের উচ্চপদস্থ আমলা জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন। তিনি ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত তার ‘লিংগুয়েস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে বাংলা উপভাষার বিভিন্ন নমুনা তুলে ধরেন।
বিভিন্ন শব্দের সাধু ও চলিত রীতি:-
| সাধু | চলিত |
|---|---|
| মস্তক | মাথা |
| জুতা | জুতো |
| তুলা | তুলো |
| জোসনা | জোছনা |
| সর্প | সাপ |
| সুতা | সুতো |
| হস্ত | হাত |
| শুষ্ক / শুকনা | শুকনো |
| বন্য | বুনো |
| কিয়াক্ষণ | কিছুক্ষণ |
| রঙ্গিন | রঙিন |
| সাতিশয় | অত্যন্ত |
| তহারা / উহারা | তারা / ওঁরা |
| অপেক্ষা | চেয়ে |
| পূর্বেই | আগেই |
| করিল | করল |
| পাইয়াছিলেন | পেয়েছিলেন |
| করিয়া | করে |