পুঁথি সাহিত্য
পুঁথি সাহিত্য বলতে ইসলামী চেতনা সম্পৃক্ত সাহিত্যকে বোঝায়। আঠারো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত আরবি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দি ভাষার মিশ্রণে রচিত এক শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের নাম পুঁথি। এ সাহিত্যের অধিকাংশ রচয়িতা এবং পাঠক উভয়েই ছিল মুসলমান সম্প্রদায়ের। একসময় বাংলায় সন্ধ্যা নামলেই বসত পুঁথি পাঠের আসর। মধ্যযুগের ধর্মভিত্তিক সাহিত্যধারা থেকে মুসলিম কবিরাই প্রথম পুঁথি সাহিত্যের মাধ্যমে সাহিত্যকে নিয়ে আসেন মানুষের কাছে। তারা তুলে ধরেন মানুষের প্রেম, দুঃসাহসিক অভিযান, অনুভূতির অনাবিল উচ্ছ্বাস।
দোভাষী পুঁথি রচয়িতাদের শায়ের বলা হত। ‘শায়ের’ আরবি শব্দ যার অর্থ কবি। মূলত মুসলমান সমাজের শায়েরগণ ‘দোভাষী পুঁথি’ রচনা করতেন। শায়েরদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ফকির গরীবুল্লাহ, সৈয়দ হামজা, মোহাম্মদ দানেশ, মালে মুহম্মদ, আব্দুর রহিম, আয়েজুদ্দিন, জনাব আলী, মনিরুদ্দিন, মুহম্মদ খাতের, মুহম্মদ মুনশী প্রমুখ। পুঁথি সাহিত্যের প্রাচীনতম কবি সৈয়দ হামজা এবং প্রথম সার্থক ও জনপ্রিয় কবি ফকির গরীবুল্লাহ।
কবিওয়ালা ও কবিগান
শায়েরদের সময়েই হিন্দু সমাজে কবিওয়ালা বা সরকারদের আবির্ভাব ঘটে। কবিওয়ালারা ‘কবিগান’ রচনা করতেন। কবিগানের আদিগুরু গোঁজলা গুই।
কবিগান এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক গান। দুটি দলের মধ্যে এ প্রতিযোগিতা হয়। কবিগানের আসরে একজন প্রধান গায়ক এবং কয়েকজন সহকারী থাকত। প্রধান গায়ককে ‘কবিয়াল বা সরকার’ এবং সহকারীদের বলা হতো ‘দোহার’। সহকারীরা সাধারণত প্রধান গায়কের কথাগুলি পুণরাবৃত্তি করতো। ১৮৫৪ সালে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সর্বপ্রথম কবিগান সংগ্রহ করেন এবং ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
কবিওয়ালাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- গোঁজলা গুই, রাসু-নৃসিংহ, হরু ঠাকুর, নিলু ঠাকুর, নিতাই বৈরাগী, রাম বসু, এন্টনি ফিরিঙ্গি, নিধুবাবু, দাশরথি রায় প্রমুখ। চারণকবি মুকুন্দ দাস প্রকৃতপক্ষে ছিলেন একজন কবিয়াল। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল চট্টগ্রামের রমেশ শীল। তিনি মাইজভান্ডারী গানের কিংবদন্তি গায়ক ছিলেন।