লোকসাহিত্য হল মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনী, ছড়া, গান, কথা, গীতিকা, ধাঁধাঁ, গাঁথা প্রভৃতির সমষ্টি। একে বাংলা সাহিত্যের শিকড়সন্ধানী সাহিত্যও বলা হয়। সাধারণত কোন লোকালয়ের লোকমুখে প্রচলিত অলিখিত সাহিত্যই লোকসাহিত্য। বাংলার অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী এ সাহিত্যে অবদান রেখেছে। এদের একটি বড় অংশ হল লোক-কবি বা বায়তি। যেমন- মনসুর বায়তির একটি পালাগান হচ্ছে ‘দেওয়ানা মদিনা’। এছাড়া ‘হারামনি’ একটি উল্লেখযোগ্য লোকসাহিত্য। এর সংকলক মুহম্মদ মনসুউদ্দীন।
লোকসাহিত্যের আদিরূপ হচ্ছে ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন ও ধাঁধা। এর প্রাচীনতম নিদর্শন ছড়া। ডাক ও খনার বচনকে লোকসাহিত্যের আদি নিদর্শন বলা হয়। ডাক ও খনার বচনগুলো প্রাচীন যুগে সৃষ্টি হয়, তবে মধ্যযুগে সমৃদ্ধি লাভ করে। বৌদ্ধ সমাজে ডাক-এর বচনের উৎপত্তি হয়েছিল আর খনার বচন সৃষ্টি হয়েছিল হিন্দু সমাজে। মূলত কৃষক ও কৃষাণীরা এগুলো মুখস্ত রাখত। ডাকের বচন ‘ডাকের কথা’ বা ‘ডাক পুরুষের কথা’ নামেও পরিচিত। খনার বচনগুলো কৃষিভিত্তিক। এগুলো থেকে কৃষি, আবহাওয়া ও সমাজের পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। খনার বচনের মূলভাব হচ্ছে শুদ্ধ জীবনযাপন রীতি।
উদাহরণ:
- ঘরে আখা বাইরে রাঁধে, অল্প কেশ ফুলাইয়া বাঁধে (ডাক)
- গাছে গাছে আগুন জলে, বৃষ্টি হবে খনায় বলে (খনা)
সংগ্রহ
চন্দ্রকুমার দে বাংলা লোকসাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য সংগ্রাহক। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের আগ্রহে ও স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেন। তার সংগৃহীত সাহিত্যগুলো ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ নামে প্রকাশিত হয়। এছাড়া বাংলা লোকসাহিত্য নিয়ে রেভারেন্ড লাল বিহারী ‘Folk Tales of Bengali (১৮৮৩)’, ড. সুনীল কুমার দে ‘প্রবাদ সংগ্রহ’ ও ড. মযহারুল ইসলাম ‘কবি পাগলা কানাই’ নামক গ্রন্থ রচনা করে লোকসাহিত্য সংরক্ষণে ভূমিকা রেখেছেন।
লোকগীতিকা
লোকগীতিকায় আবৃতির পাশাপাশি লৌকিক প্রকাশভঙ্গির গীত হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল নাটকীয়তা ও সংলাপধর্মিতা। বাংলাদেশে সংগৃহীত গীতিকাগুলোকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: নাথ গীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা।
নাথ গীতিকা
নাথ গীতিকাগুলো একটিমাত্র ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত। রাজা গোপীচাঁদ বা গোবিন্দ চন্দ্র মায়ের নির্দেশে যৌবনে দুই নব পরিণীকা বধূকে রেখে সন্ন্যাস অবলম্বন করেন। এই কাহিনীকে ঘিরেই রচিত নাথগীতিকা ‘গোপীচাঁদের সন্ন্যাস’। শুকুর মুহম্মাদ এর রচয়িতা। এছাড়া ভবানীদাস রচিত ‘ময়নামতির গান’ একটি নাথ গীতিকা।
মৈমনসিংহ গীতিকা
বৃহত্তম ময়মনসিংহ জেলার মানুষের মুখে মুখে যে গীতিকাগুলো প্রচলিত ছিল তার সংকলনই হল ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। এতে মোট ১০টি গীতিকা রয়েছে। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় এটি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ২৩টি ভাষায় মুদ্রিত হয়েছে। গীতিকাগুলো নিম্নরূপ-
| মৈমনসিংহ গীতিকার নাম | রচয়িতা |
|---|---|
| মহুয়া (চরিত্র: নদের চাঁদ, মহুয়া) | দ্বিজ কানাই |
| মলুয়া দস্যু কেনারামের পালা দেওয়ান ভাবনা | চন্দ্রাবতী |
| কমলা | দ্বিজ ঈশান |
| দেওয়ানা মদিনা (চরিত্র: আলাল, দুলাল, মদিনা) | মনসুর বয়াতি |
| চন্দ্রাবতী | নয়ানচাঁদ ঘোষ |
| কঙ্ক ও লীলা | দমোদর, রঘুসুত ও নয়াচাঁদ |
| কাজলরেখা রূপবতী | অজ্ঞাত |
পূর্ববঙ্গ গীতিকা
ড. দীনেশচন্দ্র সেন নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে এগুলো সংগ্রহ করেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থানুকুল্যে তিনি ১৯২৬ সালে ৩ খন্ডে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ প্রকাশ করেন। এতে ৫০টির অধিক পালাগান রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু পূর্ববঙ্গ গীতিকা হল- নিজাম ডাকাতের পালা, কাফন চোর, কমল সদাগর, চৌধুরি লড়াই, কাঞ্চন মালা, আয়না বিবি, ভেলুয়া, কমলা রাণীর গান ইত্যাদি।
টপ্পাগান: কলকাতা অঞ্চলের একটি লৌকিক গান। বাংলায় এটি রাগাশ্রয়ী গান হিসেবেও পরিচিত। রামনিধি গুপ্ত (নিধু বাবু) বাংলা টপ্পাগানের উদ্ভাবক।লোককথা বা লোক কাহিনী
কোন কাহিনী গদ্যের মাধ্যমে বর্ণিত হলে তাকে লোককথা বা লোককাহিনী বলে। এই কাহিনীগুলো কাব্যে রূপায়িত হলে ‘গীতিকা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অর্থ্যাৎ মানুষের মুখে প্রচলিত কাহিনী গদ্যে বর্ণিত হলে ‘কথা’ এবং কাব্যে বর্ণিত হলে ‘গীতিকা’। ড. আশুতোষ মুখপাধ্যায়ের মতে লোককথা ৩ প্রকার। যথা: রূপকথা, উপকথা ও ব্রতকথা।
রূপকথা: অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য কাহিনী নিয়ে রচিত সাহিত্য হচ্ছে রূপকথা। বাংলা সাহিত্যে কিছু জনপ্রিয় রূপকথা হল – দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের ‘ঠাকুমার ঝুলি’, ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’, ‘কিশোরের মন’ , উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরির ‘টোনাটুনির বই’।
উপকথা: পশুপাখি মানবচরিত্রের মত কথা বলে এমন ভাবে সাহিত্যের বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। কৌতুক সৃষ্টি এবং নীতি প্রচারই এগুলো সৃষ্টির উদ্দেশ্য।
ব্রতকথা: বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেয়েলি ব্রতের সাথে সম্পর্কিত কাহিনি অবলম্বনে ব্রতকথা নামে এক ধরনের সাহিত্য বিকাশ ঘটেছে।
ড. দীনেশচন্দ্র সেন
দীনেশচন্দ্র সেন একজন স্মরণীয় লোক-সাহিত্যবিশারদ। ১৮৬৬ সালে মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত বৈদ্যব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা জেলার সুয়াপুর গ্রামে তার পৈত্রিক নিবাস। তিনি ১৮৯০-এ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকালে গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে প্রাচীন বাংলার পুঁথি সংগ্রহ করেন। সেসব উপকরণের সাহায্যে ১৮৯৬-এ “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” শিরোনামে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। ১৯১১ সালে তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ “হিস্ট্রি অব বেঙ্গলি লিটেরেচার” প্রকাশিত হয়। তিনি মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা সম্পাদনা করেন।
এক নজরে লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি
- লোকসাহিত্য হল – লোকের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনী, গান, ছড়া ইত্যাদি
- বাংলার লোক সাহিত্যগুলোর একজন সংগ্রাহক হলেন – চন্দ্রকুমার দে। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের আগ্রহে ও স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহ করে।
- ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ এর সম্পাদনা করেন – ড. দীনেশচন্দ্র সেন
- নাথ গীতিকা – একটিমাত্র ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু অবলম্বনে রচিত হয়।
- লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী গদ্যের মাধ্যমে বর্ণিত হলে – লোক কথা বা কাহিনী
- লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী কাব্যে মাধ্যমে বর্ণিত হলে – গীতিকা
- অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য কাহিনী নিয়ে রচিত সাহিত্য – রূপকথা
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন