🔳🔳 পূর্বকথনঃ
লিপির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ বিভিন্ন আধারে কালির আচড়ে নিজেদের মনের কথাকে ধরে রাখতে চেয়েছে। কখনও প্রার্থনা বাণী, গান বা কবিতার ছলে হৃদয়ের কথা, ঐতিহাসিক সত্য আবার কখনোবা প্রয়োজনীয় বার্তা গাছের বাকলে, পশুর চামড়ায়, কাপড়ের খণ্ডে ফুটে উঠেছে। কাগজ আবিষ্কারের পর থেকে লেখার প্রচলন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু ছাপার অক্ষরে এই লেখা ফুটিয়ে তুলতে অপেক্ষা করতে হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী। প্রথমদিকে কাঠের ছাঁচে কালি লাগিয়ে কাগজের উপর ছাপ দেয়ার মাধ্যমে ছাপার কাজ শুরু হয়। কিন্তু প্রকৃত ছাপাখানা আসে আরও পরে। ছাপাখানার সূচনালগ্নে হস্তচালিত বা পায়ের দ্বারা চালিত মুদ্রণযন্ত্র দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় ছাপাখানার ব্যবহার শুরু হয়। এই ধারাতেই বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলায়ও ছাপাখানার সূচনা হয়।
🔳🔳 ছাপাখানার সূচনাঃ
💠💠 প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ ও কাঠের ব্লকের ছাপাঃ
ছাপাখানার ইতিহাসের প্রাচীনত্বের প্রমাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ১৯০০ সাল। এই সালে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের তুং হুয়াং শহরের হাজার বুদ্ধের গুহায় আবিষ্কৃত হয় বুদ্ধের উপদেশপূর্ণ 'হীরক সূত্র' বা 'ধরণী সূত্র' নামক এক মুদ্রিত নিদর্শন। বর্তমানে বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত ও পৃথিবীর প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক হিসেবে প্রমাণিত এই নিদর্শনের মুদ্রণকাল ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ। এটি ছাপানো হয়েছিলো কাঠের ব্লকের সাহায্যে। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এভাবেই কাঠের ব্লক ব্যবহার করে পুস্তক ছাপানো হতো।
💠💠 ইওহান গুটেনবার্গ ও প্রথম ধাতব অক্ষরের ছাপাখানাঃ
সর্বপ্রথম আধুনিক মানের ধাতব অক্ষরের ছাপাখানা আবিষ্কার করেন জার্মানীর ইওহান গুটেনবার্গ (১৩৯৮-১৪৬৮)। ১৩৯৮ সালে জার্মানির মাইনজ শহরে জন্মগ্রহণ করা এই মহান উদ্ভাবক খুবই অল্পবয়সে পৈতৃক পেশা স্বর্ণ ও হীরকের কর্মকারের কাজে যোগদান করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই অলঙ্কার ও আয়না তৈরির কাজ করতে গিয়ে ধাতব ব্লক তৈরির কৌশল শিখে ফেলেন। এই কৌশল থেকেই অক্ষর তৈরির কাজে হাত দেন গুটেনবার্গ। ১৪৫২ সালে ফাস্ট সফারের আর্থিক সহায়তায় মাইনজেই প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের প্রথম ধাতব মুদ্রাক্ষর সম্বলিত ছাপাখানা। এই ছাপাখানা থেকে প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ বাইবেল।
💠💠 কোয়েনিগ ও আধুনিক ছাপাখানাঃ
গুটেনবার্গ উদ্ভাবিত কাঠ নির্মিত হস্তচালিত ছাপাখানা নানারূপে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০০ বছর টিকে থাকে। মুদ্রণযন্ত্রের এই সনাতন ধারায় প্রথম পরিবর্তন আনেন ফ্রেডরিক কোয়েনিগ। তাই তাকেই মুদ্রণযন্ত্রের প্রকৃত আবিষ্কারক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কোয়েনিগ ১৮১৪ সালের নভেম্বর মাসে দি টাইমস পত্রিকার মালিক জন ওয়াল্টারের অর্থায়নে লন্ডনে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন। এখান থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় দি টাইমস পত্রিকার ১৮১৪ সালের ২৯ নভেম্বর সংখ্যা। এখান থেকে বিকশিত হয়েই এসেছে বর্তমান ছাপাখানা।
🔳🔳 ভারতীয় উপমহাদেশে ছাপাখানাঃ
💠💠 পর্তুগিজ ছাপাখানাঃ
১৪৯৮ সালে প্রথম ইউরোপীয় জাতি হিসেবে ব্যবসায় ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতে আসে পর্তুগিজরা। তাদের হাতেই ১৫৫৬ সালে উপমহাদেশে প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের গোয়া বন্দরে। তবে এটি ছিল পর্তুগিজ ভাষার ছাপাখানা। পর্তুগিজরা এই ছাপাখানা থেকে তাদের ধর্মপ্রচারের কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন প্রকাশনার কাজ করতো।
💠💠 কলকাতায় প্রথম ছাপাখানাঃ
জেমস অগাস্টাস হিকি কলকাতায় প্রথম ইংরেজি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে। প্রথমে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক বিল ও বাট্টার কাগজ ছাপাতেন। এরপর হিকি ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে একটি ইংরেজি সংবাদপত্র এখান থেকেই প্রকাশ করেন।
🔳🔳 বাংলা ছাপাখানার ইতিহাসঃ
💠💠 চার্লস উইলকিন্স ও প্রথম বাংলা ছাপাখানাঃ
সময়টি ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ। ভারতের তৎকালীন গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস এর নির্দেশে ভারতে আসা নবীন বৃটিশ অফিসারদের বাংলা ভাষা শিক্ষা দিতে 'নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড' নামক কোম্পানির এক সিভিলিয়ান রচনা করেছিলেন বাংলা ভাষার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ। 'A Grammar of the Bengal language' নামক ইংরেজিতে রচিত এই ব্যাকরণের উদাহরণ সমূহে লেখক যুক্ত করেছিলেন বাংলা পাঠ ও টীকা। তাই এর ছাপার সময় আসলে বাংলা মুদ্রাক্ষরের প্রয়োজন পড়ে। এগিয়ে আসেন আরেকজন ইংরেজ সিভিলিয়ান যার নাম চার্লস উইলকিন্স। তার প্রয়াসেই বাংলা ছাপার অক্ষর প্রথম নকশা পায় এবং বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তাকে বাংলা ছাপাখানার জনক অভিধায় ভূষিত করা হয়। কিন্তু তার প্রণীত নকশার আদলে মুদ্রণযোগ্য হরফ নির্মাণের সময় এগিয়ে আসেন বাংলার জোহান্স গুটেনবার্গ পঞ্চানন কর্মকার। তিনিই প্রথম চলনশীল ধাতব বাংলা মুদ্রাক্ষর খোদাই করেন। তাই তাকে বলা হয় বাংলা মুদ্রাক্ষরের জনক। ঐতিহাসিক এই ছাপাখানাটি ‘অ্যান্ড্রুস প্রেস’ নামে সবার কাছে পরিচিত।
💠💠 শ্রীরামপুর মিশন প্রেসঃ
বাংলা মুদ্রণ ইতিহাসে শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেসের অবদান অনস্বীকার্য । উইলিয়াম কেরি, জন ক্লার্ক মার্শম্যান (১৭৬৮-১৮৩৭), উইলিয়াম ওয়ার্ডের (১৭৬৯-১৮২৩) মতো কিছু উৎসাহী ব্যক্তি ১৮০০ সালের ১০ জানুয়ারি ছাপাখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই ছাপাখানা থেকে ধর্মপুস্তকসহ বিভিন্ন বিষয়ের অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। ছাপাখানাটির সঙ্গে ইংরেজদের পাশাপাশি দুজন বাঙালির নাম জড়িয়ে আছে। প্রথমজন সেই পঞ্চানন কর্মকার আর দ্বিতীয়জন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। গঙ্গাকিশোর ছিলেন একাধারে মুদ্রণশিল্পী, পুস্তক ব্যবসায়ী, প্রকাশক এবং সেই সঙ্গে গ্রন্থকার। তিনি প্রথম বাঙালি প্রকাশক হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত। গঙ্গাকিশোর কলকাতায় ‘বাঙ্গালী প্রেস’ নামের একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
💠💠 পূর্ববঙ্গে ছাপাখানাঃ
🔵 পর্তুগিজ প্রয়াসঃ
পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশেও পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে বাংলা প্রকাশনার সূচনা হয়। জানা যায়, ঢাকার ভাওয়াল পরগনায় নাগরীর গির্জা ও মিশনে প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানাটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো। যদিও সে সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি, তবে এতটুকু জানা গেছে যে এখান থেকে পাদ্রি ম্যানুয়েল দা আসুম্পসাও তিনটি বাংলা বই প্রকাশ করেছিলেন।
🔵 রংপুর বার্তাবহযন্ত্রঃ
পূর্ববঙ্গে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠায় পর্তুগিজ প্রয়াস সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি থাকলেও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, পূর্ববঙ্গের প্রথম ছাপাখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উত্তরের জনপদ রংপুরে। ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বার্তাবহ যন্ত্র’ ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হতো রংপুরের প্রথম সাময়িকপত্র ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’। পত্রিকাটির প্রকাশক ছিলেন গুরুচরণ রায়।
🔵 ঢাকায় ছাপাখানাঃ
রংপুরের পর ঢাকার ছোট কাটরায় প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানাটিকে বাংলার পুরনো প্রেস বলা যায়, যা পরে ‘ঢাকা প্রেস’ নামে পরিচিত হয়। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই প্রেসে শুধু ইংরেজি ছাপার ব্যবস্থা ছিল। এখান থেকে ‘দ্য ঢাকা নিউজ’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো।
তবে ১৮৬০ সালে বাবুবাজারের ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ বা 'বাংলা প্রেস'কেই ঢাকার পুরনো বাংলা ছাপাখানার মর্যাদা দেওয়া হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা মালিক ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র। বিখ্যাত ‘ঢাকা প্রকাশ’ সাময়িকপত্রটি প্রকাশিত হতো এই ছাপখানা থেকে। এখান থেকে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ দীনবন্ধু মিত্র রচিত 'নীল দর্পণ'।
এদুটো ছাড়াও ‘সুলভ প্রেস’ (১৮৬৩) বা ‘গন্ডেরিয়া যন্ত্র’ (১৮৯১) ঢাকার ছাপাখানার প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রেস। এভাবেই বাংলা ছাপাখানা বিকশিত হতে হতে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে।